শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬

শেষ চিঠি| ছোট গল্প

কাজী নাজরিন

কই গো? কই গেলা?খেতে দিবা না? অনর্গল বলেই যাচ্ছে রাহাত মিয়া। কিন্তু রহিমা বানুর কোন সাড়া শব্দ নেই।রহিমা বানু গল্প করছেন পাশের বাড়ির চাচীর সাথে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে। রাহাত মিয়া, স্ত্রী রহিমা বানুকে খুঁজে পেয়ে বলতে লাগলো, চাচীর সাথে কি গল্প করা হচ্ছে রহিমা ? এদিকে রাহাত মিয়া দেখতে পেলেন চাচী আর রহিমা দুজনের মুখেই হতাশার চিত্র! রাহাত মিয়া ও গল্পে যোগ দিলেন। চাচী বলতে লাগলেন, দেখো বাবা রাহাত, যু*দ্ধে যোগ দিবে ঠিক আছে কিন্তু বউ বাচ্চাদের কথাও একটু মাথায় রাখিও।চাচী আরো বলতে লাগলেন, তোমার ছোট্ট বাচ্চাদের দেখার মতো তুমি ছাড়া আর কেউ নেই কিন্তু! রহিমা বানুর কোলে থাকা দুই বছরের ছেলেটা এতক্ষণে বাবাকে দেখে লাফ দিয়ে বাবার কোলে চলে গেলো মায়ের কোল থেকে।এদিকে চার বছরের মেয়েটা বাবাকে ঘিরে ছোটাছুটি করছে এদিক ওদিক। রহিমা রাহাত দম্পতির মেয়ের নাম মালা,আর ছেলের নাম মুকুল।রাহাত মিয়া তখন চাচী আর রহিমার কথায় জবাব দিতে গিয়ে বললেন, দেশের এখন যে অবস্থা এখন আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই।সবাই যদি পরিবারের কথা চিন্তা করে ঘরে বসে থাকি তাহলে দেশের কি হবে?রাহাত মিয়া আরো বলতে লাগলো, দেশ শান্তি থাকলেই তো পরিবার শান্তিতে থাকবে!

তখন ১৯৭১ সাল দেশ জুড়ে পাক-হানাদার বাহিনী নানা তান্ডব চালাচ্ছে একের পর এক। এদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আহবানে সবাই যু*দ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাহাত মিয়াও নিজের ছোট্ট ব্যবসার কথা না ভেবে যু*দ্ধে যেতে পুরোপুরি প্রস্তুত। এদিকে রাহাত মিয়ার স্ত্রী এটা নিয়ে খুব চিন্তিত কারণ রাহাত মিয়া চলে গেলে রহিমা কষ্টে পড়ে যেতে পারে।রাহাত মিয়া কিন্তু পরিবারের জন্য খাবার দাবার সব সংগ্রহ করছে আস্তে আস্তে যাতে করে তার অবর্তমানে স্ত্রী এবং সন্তানদ্বয় ভালো থাকে।স্বামী স্ত্রী দুজন মিলে অনেক পরিকল্পনা ও করছে কিভাবে কি করবে। স্ত্রী রহিমা বানু ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও স্বামী রাহাত মিয়া কে সব সময় মনোবল দিয়ে যাচ্ছে যাতেকরে স্বামী রাহাত মিয়া সাহস পায়।আর মাত্র দু’দিন পর রাহাত মিয়া চলে যাবে যু*দ্ধে যোগ দিতে।আজ পুকুরের বড় মাছ ধরে এনেছে রাহাত মিয়া। স্ত্রী রহিমা বানু নিজের হাতে পালন করা রাতা মোরগটা জবাই করতে নিলে রাহাত মিয়া হাত থেকে নিয়ে ছেড়ে দেয় এমনকি রাহাত মিয়া স্ত্রী রহিমা বানুকে বলতে লাগলো, রহিমা এইসব এখন অপচয় করার সময় নেই।সামনে খুব খারাপ সময় আসতে পারে তখন তোমার কাজে লাগবে।

যাইহোক একসাথে বসে রহিমা বানু আর রাহাত মিয়া বাচ্চাদের সাথে দুপুরের খাবার খেতে খেতে বাচ্চাদের নিয়ে নানান কথা ভাগাভাগি করলেন একে অপরের সাথে। রাহাত মিয়া মেয়ে মালা কে নিজের হাতে ভাত খাইয়ে দিলেন, ছোট্ট ছেলে মুকুলের মুখেও ভাত তুলে দিলেন একটু একটু। দুপুরের খাবার শেষে রাহাত মিয়া পাশের মহল্লায় গেলো সবার সাথে আলোচনা করতে।
সন্ধ্যার পরপর রাহাত মিয়া ঘরে চলে আসলো কারণ দেশের পরিস্থিতি তখন ভালো ছিলো না।এদিকে মালা আর মুকুল বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলো। বাচ্চা দুটো বাবার জন্য খুব বেশি অস্থির করে ঘরে ফিরতে দেরি হলে।বাবা রাহাত মিয়া ও তাই রোজ রোজ সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরে আসেন।রহিমা বানু স্বামী ঘরে ফিরলেই একসাথে বসে খোশগল্প করেন আর বাচ্চাদের নিয়ে খাবার দাবার ও একসাথে করেন।আজ বাচ্চা দুটো কে বুকে নিয়ে অনেক আদর করলেন রাহাত মিয়া আর নিজের হাতে রাতের খাবার ও খাইয়ে দিলেন। বাচ্চা দুটো বাবার আশেপাশে অনেকক্ষণ গড়াগড়ি করে ঘুমিয়ে পড়ে ছে।বাচ্চাদের এমন আচরণ দেখে রহিমা বানুর দুচোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো। রহিমা বানু মনে মনে ভাবতে লাগলো, আর মাত্র একদিন পর তার স্বামী যু*দ্ধে চলে গেলে অবুঝ বাচ্চা দুটো নিয়ে কিভাবে দিন কাটাবে। রহিমার এমন মলিন চেহারা দেখে রাহাত মিয়া রহিমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো, রহিমা চিন্তা করো না আমি ঠিকই আবার তোমাদের মাঝে ফিরে আসবো।আজ অনেক রাত পর্যন্ত রহিমা বানু আর রাহাত মিয়া তাদের সব কিছু সম্পর্কে পরিকল্পনা করলো। রাহাত মিয়া, পাশের বাড়ির কাদের চাচাকে বলে রেখেছেন যেনো রহিমার বিপদ আপদে সাহায্য করেন।

আজ রাহাত মিয়ার চলে যাওয়ার দিন। খুব ভোরে উঠে রহিমা বানুর হাতে পান্তা ভাত খেলেন রাহাত মিয়া। মালা মুকুল ঘুমে ছিলো তাই তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে আর কপালে চুমু খেয়েছে রাহাত মিয়া। যাওয়ার সময় রহিমা বানু কে দু’হাতে গায়ে হাত বুলিয়ে বিদায় নিলেন।

এদিকে রাহাত মিয়া গিয়ে যু*দ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। রহিমা বানু,মালা আর মুকুল কে বুকে আগলে ধরে দিন কাটাতে লাগলো। স্বামী রাহাত মিয়ার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করে রহিমা বানু রোজ রোজ নামাজের মোনাজাতে।এদিকে রাহাত মিয়া যু*দ্ধে অংশগ্রহণ করার কিছুদিন পর তাকে ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। রাহাত মিয়া ভারত যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে স্ত্রী রহিমা বানুর নিকট একটা চিঠি পাঠিয়েছে!চিঠিতে লিখেছে,
রহিমা,
কেমন আছো? জানি তোমার মন ভালো নেই তাও অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করছি।আমার কলিজার টুকরো মালা,মুকুল কেমন আছে? নিশ্চয়ই রাতের বেলা আমার জন্য আমার বাচ্চা দুটো ছটফট করে থাকে কিন্তু জানো রহিমা, আজ আমি দেশের জন্য তোমাদের সবাইকে এইভাবে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।আমার চিঠি খানা পাবে কিনা সেটাও ঠিক জানিনা। তবুও লিখছি।জানো রহিমা, আমাকে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে পাঠানো হচ্ছে। আমি যে মানুষ কখনো গ্রামের বাহিরে যাইনি আজ দেশের জন্য দেশের বাহিরে যাচ্ছি।রহিমা তোমাকে বউ করে ঘরে আনার পর থেকে কখনো ঘরের বাহিরে কোথাও গিয়ে থাকতে পারিনি আজ দেশের বাহিরে যাচ্ছি!আমার দু’চোখের সামনে বারবার তোমাদের তিনজনের ছবি ভাসছে!
রহিমা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুব খারাপ যাচ্ছে, সামনে আরো বেশি খারাপ হতে পারে তুমি আর মালা মুকুল ভালো থেকো সেটা প্রার্থনা করি আল্লাহর কাছে। দেশের পরিস্থিতি যদি ভালো হয়, আমরা যদি স্বাধীনতার রঙিন সূর্য ছিনিয়ে আনতে পারি ইনশাআল্লাহ আমাদের সুখের অন্ত রইবে না।আল্লাহর হেফাজত করে তোমাদের রেখে আসলাম।দেশের জন্য যু’দ্ধ করতে গিয়ে হয়তো আমি আর ফিরে না-ও আসতে পারি কিন্তু তুমি আমার বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদে থেকো।আমাকে নিয়ে একদম ভাবতে হবে না।আমিতো তোমাদের জন্য, দেশের জন্য,দেশের মানুষের জন্য যু’দ্ধে অংশগ্রহণ করেছি।জানো রহিমা, পাকহানাদার বাহিনী হতে দেশকে বাঁচাতে হলে আমাদের ভারতীয় প্রশিক্ষণ খুব জরুরী তাই আমাদেরকে পাঠানো হচ্ছে।অনেক কিছু লিখতে মন চাচ্ছে কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। ভালো
থেকো। আজ আর নয়।
ইতি
মালা মুকুলের বাবা।
এদিকে রাহাত মিয়া ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। অনেকগুলো অপারেশনে সফলতা দেখিয়ে রাহাত মিয়া সুনাম অর্জন করেছেন। যার ফলে রাহাত মিয়াকে একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গুলোতে যু’দ্ধ করতে পাঠানো হয়েছে।দেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন রাহাত মিয়া পাক বাহিনীর সাথে সন্মুখ যু’দ্ধে নিজ হাতে বেশ কয়েকজন পাক বাহিনীকে হ’ত্যা করেন। এরই মধ্য দিয়ে আরো কঠিন প্রতিকূল মুহূর্তেও রাহাত মিয়া সবার সম্মুখে অবস্থান করতে থাকে।পাক বাহিনীর সাথে সন্মুখ যু’দ্ধের এক পর্যায়ে পাক বাহিনীর গু’লিতে রাহাত মিয়ার সতেজ সাহসী শরীর নিথর হয়ে যায়! রাহাত মিয়া চিরতরের জন্য না ফেরার দেশে চলে গেলেন। এদিকে বাঙালির অদম্য সাহসিকতার কাছে পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। বাঙালী স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে এনেছে।বাঙালি জাতি বাংলার বুকে নিজেদের লাল সবুজের পতাকা পেয়েছে। এদিকে বিজয়ের পর মুক্তিযোদ্ধারা একে একে বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে।রহিমা বানুও স্বামী রাহাত মিয়ার অপেক্ষায় আকুল হয়ে আছে।দিন যায় রাত যায় কিন্তু রাহাত মিয়া আর ফিরে আসেনি।লোক মারফত পাঠানো রাহাত মিয়ার লিখা সেই চিঠিই কেবল এখন রহিমা বানুর কাছে স্বামীর প্রতিচ্ছবি হয়ে রইলো। মালা মুকুলের বাবা আর তাদের কাছে ফিরে আসবে না।

লেখকঃ কবি ও গল্পকার

  • সর্বশেষ
  • পঠিত