শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬

অপমান : ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গি 

হাফেজ মো. সেলিম উদ্দীন

সৃষ্টির সেরা জীব হলো মানুষ

মানুষ সৃষ্টি এক মাত্র আল্লাহর সৃষ্টি এই মানুষ কে এক শ্রেণির লোক যাদের অধীনে চাকরি করে মালিক, কমিটি, ও প্রধান বা বস, তার সহকারি ও সহকর্মী দের সাথে কেমন আচরন হওয়া উচিত?ছোট কোন বিষয় নিয়ে অপমান করতে পারলে তাদের মনের মাঝে এক ধরনের আনন্দ চলে আসে, তারা যদি মুসলিম ও মুসলমান হয়ে থাকে তাহলে নিজের পরকালের সর্বনাশ তারা নিজেরাই ডেকে আনছে।

সবার সামনে কাউকে অপমান করো না। কেউ ভুল করলে, একান্তে বলো—
তাতে তার সম্মান রক্ষা পাবে, আর তোমার মর্যাদা আরও বাড়বে।
কারণ অপমান মানুষ ভোলে না, কিন্তু সম্মান সে হৃদয়ে রেখে দেয় চিরকাল।মানুষকে অপমান করার শাস্তি: আল-কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ

মানুষকে অপমান করা বা অবমূল্যায়ন করা একটি জঘন্য ও গর্হিত কাজ, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন, এবং সেই সম্মানকে ছোট করা একধরনের জুলুম বা অন্যায়।

কোরআনের আলোকে:

১. সম্মানিত সৃষ্টির অবমাননা:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ…“আমি তো বনী আদমকে মর্যাদা দিয়েছি…”— (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০)

🔎 এই আয়াতে আল্লাহ বলেন যে, তিনি মানুষকে সম্মানিত করেছেন। তাই কাউকে অপমান করা মানে আল্লাহর দেয়া সেই সম্মানকে অপমান করা।

২. অন্যকে উপহাস করা হারাম:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ…

“হে ঈমানদারগণ! একদল যেন অন্যদলের উপহাস না করে…”— (সূরা আল-হুজরাত, ৪৯:১১)

এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো জাতি বা ব্যক্তি যেন অন্যকে উপহাস না করে। কারণ আল্লাহর কাছে সে হয়তো বেশি মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে।

হাদিসের আলোকে:

১. অপমানকারী জাহান্নামের উপযুক্ত:”المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده”

“সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।”— (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১০)

🔎 যে ব্যক্তি অন্যকে জিহ্বা দিয়ে অপমান করে, সে প্রকৃত মুসলমান নয় বলে হাদিসে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

২. অন্যকে হেয় করা গোনাহের কাজ:”بحسب امرئ من الشر أن يحقر أخاه المسلم” “কাউকে হেয়জ্ঞান করাই যথেষ্ট বড় পাপ।”— (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)

শুধু কাউকে হেয়জ্ঞান করাটাই যথেষ্ট বড় গোনাহ, যা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

৩. অপমান করলে কিয়ামতের দিন প্রতিশোধ হবে:
এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! যে ব্যক্তি অন্যের উপর জুলুম করেছে, তার কি পরিণতি?”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “কিয়ামতের দিন তার নেক আমল থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়া হবে, না হলে অন্যের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”— (সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৪৪৯)

মানে, কাউকে অপমান বা কষ্ট দিলে, কিয়ামতের দিনে তার শাস্তি হবেই — যদি না দুনিয়াতেই ক্ষমা চাওয়া হয়।অপমানকারীর শাস্তি (উদাহরণসহ):

উদাহরণ ১: আবু জাহল ও রাসূল (সা.)-কে অপমানআবু জাহল রাসূল (সা.)-কে বারবার অপমান করতেন, তাঁর উপর ধুলা নিক্ষেপ করতেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে বদর যুদ্ধে ধ্বংস করেন। শিক্ষা: অন্যকে অপমান করে কেউ টিকে থাকতে পারে না।

উদাহরণ ২: হযরত বিলাল (রা.)-কে ‘কালো’ বলে অপমান এক সাহাবি হযরত বিলাল (রা.)-কে তাঁর বর্ণ নিয়ে অপমান করেছিলেন। রাসূল (সা.) বললেন:“তুমি এখনো জাহিলিয়াতের মানুষ! এই বৈষম্যমূলক কথা কিভাবে বললে?”শিক্ষা: জাত, ধর্ম, গাত্রবর্ণ বা পেশা নিয়ে অপমান করা ইসলামে হারাম।

ইসলাম কী নির্দেশ দেয়?

মানুষকে সম্মান করা কারো ভুল ধরলে শালীনভাবে বলা। গোপনে নসিহত করা

জিহ্বা সংযত রাখা

ক্ষমা চাইতে শেখা

অপমানের ফলাফল:

কাজ পরিণাম

অন্যকে অপমান নেক আমল ক্ষয়ে যাবে
অপমান সহ্যকারী কিয়ামতে প্রতিদান পাবে
ক্ষমা না চাওয়া কিয়ামতের দিনে শাস্তি

উপসংহার:: মানুষকে অপমান করা একটি ভয়াবহ অপরাধ, যার পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ। ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের উচিত — কাউকে ছোট না করা, অপমান না করা এবং ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া। তবেই একটি শান্তিময় ও মর্যাদাসম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠবে।

একটি দোয়া:اللَّهُمَّ اجْعَلْ لِسَانِي صَادِقًا، وَقَلْبِي سَلِيمًا، وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَوَاضِعِينَ

“হে আল্লাহ! আমার জিহ্বাকে সত্যবাদী, হৃদয়কে পবিত্র করুন এবং আমাকে বিনয়ীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”

মহান আল্লাহ দয়া করে সকলকে কবুল করুন। আমিন!

লেখক : হাফেজ মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন, সাবেক সভাপতি পশ্চিম বরুমচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত