বছরের শেষার্ধে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাম্প্রতিক শিক্ষক বদলি সিদ্ধান্তে পাহাড়ি জনপদে আবারও “শিক্ষক বর্গা চাষ” বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ১৯ জন প্রধান শিক্ষক ও ৯০ জন সহকারী শিক্ষককে বদলি করা হলেও এই বদলিতে শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, বরং প্রশাসনিক শাস্তি , স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগই বেশি আলোচিত হচ্ছে।
শাস্তির ছলে বদলি, শাস্তি পাচ্ছে প্রজন্ম।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের অভিযোগ, বদলিকৃত অনেক শিক্ষককে শাস্তিমূলকভাবে দুর্গম এলাকায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই শাস্তির প্রকৃত ভুক্তভোগী হচ্ছে পাহাড়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কারণ, অতীতে দেখা গেছে—সদর থেকে দূরবর্তী ও দুর্গম এলাকায় বদলি হওয়া শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা বছরের অধিকাংশ সময়ই নির্ভর করে “বর্গা শিক্ষক”-এর ওপর, যাঁরা মাসে ১০-১৫ দিনও বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না।
যাঁরা অনিয়মিত, তাঁরা বহাল তবিয়তে
অভিযোগ রয়েছে, যেসব শিক্ষক বছরের অধিকাংশ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন, তাঁদের বদলি না করে আগের কর্মস্থলেই বহাল রাখা হয়েছে। অথচ যাঁরা নিয়মিত পাঠদান করতেন, তাঁদেরকেই পাঠানো হয়েছে এমন এলাকায় যেখানে যাতায়াত কঠিন, নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে এবং আবাসন সুবিধা নেই।
সার্সি চাকমার বদলি নিয়ে প্রশ্ন–
একটি আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে সার্সি চাকমার নাম। তিনি সম্প্রতি আলোচিত শিক্ষক রাতের আঁধারে আলুটিলায় ঘুরতে গিয়ে যুগল প্রেমিক প্রেমিকা হিসেবে ধরা পড়েন পরিশেষে ধর্ষণের মামলায় এক নাটকীয় নাটকের নায়িকা হন। তিনি পানছড়ির উত্তর ফাতেমা নগর গুচ্ছগ্রাম বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তাঁকে বদলি করা হয়েছে লক্ষীছড়ির ক্যমড়াছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, “সার্সি চাকমা কি সত্যিই লক্ষীছড়ির মতো দুর্গম এলাকায় গিয়ে নিয়মিত পাঠদান করবেন?”
বদলির আড়ালে কোটি টাকার বাণিজ্য?
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, এই বদলির পেছনে রয়েছে ত্রিমুখী আর্থিক লেনদেন। অভিযোগ অনুযায়ী—
– মিচুয়াল ট্রান্সফার বা পারস্পরিক বদলির ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষকের মধ্যে ৩-৪ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।
– শূন্য পদে বদলি পেতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের দিতে হয়েছে ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত।
– এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে জেলা পরিষদের কিছু অংশে গড়ে উঠেছে একটি “শিক্ষা বাণিজ্য চক্র”।
একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটা এখন ওপেন সিক্রেট। বদলি মানেই প্যাকেজ। টাকা দিলে সুবিধাজনক জায়গা, না দিলে দুর্গম পাহাড়।”
জেলা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন—
স্থানীয়রা বলছেন, জেলা পরিষদের কাজ কি কেবল চাকরি দেওয়া আর বদলি করাই? পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অথচ কোনো পরিষদই কখনো এই ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়নি—না অতীতে, না বর্তমান পরিষদে।
দাবি: সুষম ও ন্যায্য বদলি নীতির
সুশাসন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে স্থানীয়দের দাবি—- শিক্ষকদের নিজ নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে বদলি করতে হবে।-
বদলির ক্ষেত্রে নিয়মিততা, দক্ষতা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।-
বদলির নামে আর্থিক লেনদেন ও পক্ষপাতমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে।
একজন অভিভাবক বলেন, “শিক্ষক যদি নিজ এলাকায় থাকেন, তাহলে তিনি নিয়মিত স্কুলে যাবেন, বাচ্চারাও ভালো শিক্ষা পাবে। কিন্তু এখনকার বদলিতে শিক্ষার চেয়ে রাজনীতি আর পয়সার প্রভাবই বেশি।”
পাহাড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার এই সংকট শুধু একটি জেলার নয়, এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। বদলির নামে যদি বাণিজ্য হয়, স্বজনপ্রীতি হয়,আর শাস্তির নামে যদি শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়া হয়—তাহলে পাহাড়ে শিক্ষা নয়, বৈষম্যই চিরস্থায়ী হবে।
ওমর |চাখ
